www.ainadalatprotidin.com
  • বৃহঃ. মে ১৩, ২০২১

AIN ADALAT PROTIDIN

সত্যের সন্ধানে আইন-আদালত প্রতিদিন

সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগ

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বর্তমানে দেশে আলোচিত একটি ইস্যু হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনের অধীনে করা মামলার বিচার হয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে। তিনটি মামলা নিয়ে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী ঢাকায় দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালের যাত্রা শুরু করে। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়। প্রথমে আইসিটি আইনের অধীনে করা মামলার বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল হলেও বর্তমানে সারাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলারও বিচার হয় এই ট্রাইব্যুনালে। বর্তমানে এই একটি ট্রাইব্যুনালেই এ দুটি আইনের অধীনে করা প্রায় ৩ হাজার মামলা বিচারাধীন।

২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করার পর থেকে এ আইনের অধীনে দিনে দিনে মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, আইনটি পাস হওয়ার পর ২০১৮ সালেই এ আইনে ১২৬টি মামলা হয়। মামলায় আসামির সংখ্যা ছিল ৪৭৪ জন। ২০১৯ সালে মামলা হয় ৭৩২টি। আসামি করা হয় ১ হাজার ১৭৫ জনকে। ২০২০ সালে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯৬টি এবং আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ জনকে। এর পাশাপাশি আইসিটি আইনেও কিছু মামলা হচ্ছে।

এসব মামলার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে কোন বিচারপ্রার্থীকে এখন ঢাকার একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালে আসতে হয়। তবে এই দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রায় দু’বছর আগে সাতটি বিভাগীয় শহরে আরও সাতটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করে। গত মঙ্গলবার পাঁচটি বিভাগীয় শহরে স্থাপিত সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে সাইবার ট্রাইব্যুনালের জন্য কোন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নতুন পাঁচটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে আইনজীবীরা বলছেন, সাইবার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়লেও এখনো সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়নি। এর ফলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের রায় বা আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তাকে হাইকোর্টে আবেদন করতে হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে রয়েছে নানা সমস্যা। আইনে সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের মধ্যে একজন আইটি বিশেষজ্ঞ থাকবেন বলে বলা হয়েছে। কিন্তু হাইকোর্টের বিচারপতিরা সাধারণত আইটি বিশেষজ্ঞ না। এ কারণে নানা সংকট দেখা যাচ্ছে। এছাড়া নতুন পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসবে। তখন ট্রাইব্যুনালের রায়ে সংক্ষুব্ধ বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে। এ কারণে আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। তাই এখন আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘সাইবার ট্রাইব্যুনাল হয়েছে, এখন আপিল ট্রাইব্যুনালও হবে।’

নতুন পাঁচ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক : পাঁচ বিভাগীয় শহরের সাইবার ট্রাইব্যুনালগুলোতে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার পাঁচজন বিচারককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এসব জেলা ও দায়রা জজ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন। পাঁচ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন- রংপুরের সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পেয়েছেন মো: আব্দুল মজিদ। তিনি এর আগে ঠাকুরগাঁওয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পেয়েছেন বেগম কনিকা বিশ্বাস। এর আগে তিনি খুলনার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সিলেটের সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পেয়েছেন মো: আবুল কাশেম। এর আগে তিনি সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পেয়েছেন মো: জিয়াউর রহমান। এর আগে তিনি মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পেয়েছেন এস কে এম তোফায়েল হাসান। এর আগে তিনি ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন।

কবে থেকে কার্যক্রম শুরু : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে এসব ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে মামলা স্থানান্তর করতে হলে সরকারকে একটি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। কারণ ২০০৬ সালের এই আইনের ৬৮ ধারার ৪ উপধারায় বলা আছে, ‘সরকার কর্তৃক পরবর্তীতে গঠিত কোন ট্রাইব্যুনালকে সমগ্র বাংলাদেশের অথবা এক বা একাধিক দায়রা বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত উহার অংশবিশেষের স্থানীয় অধিক্ষেত্র ন্যস্ত করিবার কারণে ইতঃপূর্বে কোন দায়রা আদালতে এই আইনের অধীন নিষ্পন্নাধীন মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত, বা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় অধিক্ষেত্রের ট্রাইব্যুনালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি হইবে না, তবে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, দায়রা আদালতে নিষ্পন্নাধীন এই আইনের অধীন কোন মামলা বিশেষ স্থানীয় অধিক্ষেত্রসম্পন্ন ট্রাইব্যুনালে বদলি করিতে পারিবে’। এই ধারা অনুযায়ী মামলা নতুন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর একই ধারার ৫ উপধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে যে সাক্ষ্য গ্রহণ বা উপস্থাপন করা হয়েছে উক্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কার্যকর করতে এবং মামলা যে পর্যায়ে ছিল সেই পর্যায় হতে বিচারকার্য অব্যাহত রাখতে পারবে। আইনের এই বিধানের কারণে সরকারকে এখন প্রজ্ঞাপন জারি করে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে নতুন ট্রাইব্যুনালগুলোতে স্থানান্তর করতে হবে। তবে সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে এসব বিচারককে তাদের কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে।

সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনাল হয়নি : ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে ২০১৩ সালে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও আইন অনুযায়ী এখনো সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়নি। সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলায় সংক্ষুব্ধ হলে বিচারপ্রার্থীকে ভরসা করতে হচ্ছে হাইকোর্টের ওপর। ২০১৭ সালে ফরিদপুরের একটি মামলায় পুলিশের দেয়া ফাইনাল রিপোর্টে (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) বাদীপক্ষ সংক্ষুব্ধ হন। তাদের নারাজি আবেদন খারিজ হয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে। আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় ন্যায়বিচার পেতে একমাত্র হাইকোর্টে যাওয়ার পথই তাদের জন্য খোলা ছিল। পরে তারা হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন। এ ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীর ব্যয় ও দুর্ভোগ দুটোই বেশি। কিন্তু আপিল ট্রাইব্যুনাল থাকলে এই দুর্ভোগ কম হতো।

আইসিটি আইনের তৃতীয় অংশে সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। আইনের ৮২ (১) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার প্রজ্ঞাপন দ্বারা এক বা একাধিক সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। দফা (২)-এ বলা হয়েছে, আপিল ট্রাইব্যুনালে সরকার নিযুক্ত একজন চেয়ারম্যান এবং দুজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত হবে। (৩) দফায় বলা হয়েছে, আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এমন একজন ব্যক্তি হবেন যিনি সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ছিলেন বা বিচারক নিযুক্তের যোগ্য এবং সদস্য হবেন যিনি বিচার বিভাগের কর্মকর্তা অথবা অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ বা অন্যজন হবেন আইসিটি বিষয়ে নির্ধারিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ। তাদের মেয়াদ হবে অন্যূন তিন বছর এবং অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : ঢাকার একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমানে দুটি আইনের অধীনে করা প্রায় ৩ হাজার মামলা ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। আপিল ট্রাইব্যুনালের ব্যাপারে তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ট্রাইব্যুনাল হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০-৬০টি মামলায় হাইকোর্টে আবেদন করেছে। এই পরিমাণ মামলার জন্য একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে মনে করি না। তবে এখন যেহেতু সাইবার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বেড়েছে, মামলার নিষ্পত্তি বাড়বে। এ কারণে একটি আপিল ট্রাইব্যুনাল হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘সাইবার ট্রাইব্যুনাল যে আইনে কাজ করছে সে আইনেই আপিল ট্রাইব্যুনাল করার কথা বলা রয়েছে। একটি গঠন হলেও অপরটি করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘কেউ ট্রাইব্যুনালের আদেশ বা রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে তারা যাবেন কোথায়? উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে কিন্তু আইনে আপিল ট্রাইব্যুনালের একজন সদস্য আইটি বিশেষজ্ঞ থাকবেন বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু হাইকোর্টের বিচারপতিরা আইটি বিশেষজ্ঞ নন। তাছাড়া হাইকোর্টের বিচারপতিদের একমাসের প্রশিক্ষণ দিয়েও আইটি বিশেষজ্ঞ বানানো সম্ভব না। ফলে আইটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় বিচারের সময় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে আপিল ট্রাইব্যুনাল জরুরি বলে আমি মনে করি।

 519 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *