বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন

লুংগী সমাচার, আমাদের ঐতিহ্য: জিয়া হাবীব আহসান 

লুংগী সমাচার, আমাদের ঐতিহ্য: জিয়া হাবীব আহসান 

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

লুংগী নিয়ে একটা লিখা হতে পারে তা কখনো ভাবিনী।

লিখাটা আমার ওয়ালে প্রকাশের পর দেখলাম এটাও একটা মজার আলোচ্য বিষয়।

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক লিখেছিলেন,বিলুপ্ত প্রায় লুংগীর গৌরবের দিন ফিরিয়ে আনতে একটি মিশন হাতে নেয়া হবে। এর নাম লুচক। লুংগী চর্চা কেন্দ্র।

আবার হতে পারে, হতে পারে লুঙি পড়া আন্দলোন বা লুপআ।

 

মজলুম জননেতা মরহুম আবদুল হামিদ খান ভাসানী লুংগী পড়তেন এবং লুংগী আর বেতের টুপি পরিধান করেই চীন সফর করেন। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী পুরুষ হলে তিনিও লুংগী পড়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হন। মায়ানমার,নেপাল ভূটান, পাক ভারত উপমহাদেশ ছাড়াও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ লুংগী প্রেমে আচ্ছন্ন। আমাদের দেশে বাচ্চাদের খাৎনার সাথে সাথে একটা লুংগী পরিয়ে দিই।

 

কবি ফরহাদ মঝহার কে লুংগী পড়ে ঢাকা ক্লাবে ঢুকতে না দেয়ায় তাঁর প্রতিবাদী লিখা বাংলার বিপ্লবী সাহিত্যে নতুন মাত্রা লাভ করেছে। লুংগী আসলে এক অপূর্ব সৃষ্টি। বিদেশীদের কাছে এটা অস্টম আশ্চর্য। মার্কিন রাস্ট্রদূত ড্যান মজীনা লুংগীর প্রেমে পড়ে লুংগী পরে রিকশা চালিয়ে ফটোসেশান করেন। অনেক গুলো লুংগী কিনে সাথে নিয়ে যান।

কবি সৈয়দ আবুল মকসূদ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সেলাই ছাড়া লুংগী পরেন। এ-র এয়ারকন্ডিশনিং ক্ষমতা অসাধারণ। আমাদের মতো আদ্রতার দেশের জন্য খুবই উপকারী।নদীমাতৃক বাংলাদেশে লুংগীর উপকারীতা নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন। কবি কায়সার হক এবিষয়ে একটি দীর্ঘ ইংরেজি কবিতাও লিখেছেন। লুংগী নিয়ে বহু প্রবাদ বাক্যও আছে। যেমনঃ-

‘” যষ্মিন দেশে যদাচার,কাছা খুলে নদী পার।'”

অনভ্যস্ত লোকজনের লুংগী ব্যবহার নিয়ে কিছু বিড়ম্বনার কথা শুনা গেলেও বিশ্বে লুংগীর কদর কখনো কমবার সম্ভাবনা নেই।

ইউরোপ আমেরিকায় অনেক 🇧🇩 বাংলাদেশীদের ঘরে ঘরে লুংগী পড়ার অভ্যাস রয়ে গেছে। পেন্ট পরে ঘরে চলা ফেরা ও ঘুমাতে অস্বস্তি অনুভব করেন। মানবাধিকার আইনজীবী বন্ধু Sharif Uddin আমেরিকা যাওয়ার প্রাক্কালে ডজনখানেক লুংগী নিয়ে গেছেন। ভার্জিনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা আমার ছোট মামা শ্বশুর Naushad Chowdhury বলেন, মামা এখানেও আমি বাসায় লুংগী পরিধান করে আরাম পাই। আমি লুংগী ছাড়তে পারিনি।

 

লুংগী পরে ছতর ঢাকার কঠিন সংগ্রামের কথা আজো মনে পড়ে। ঘুম থেকে ওঠে দেখি সামনের গেরো পেছনে চলে গেছে।ছতর ঢাকার জন্যে নীচেও একটা গেরো দিতাম। পরে অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে যাই।

জনপ্রিয় সিপ্লাস অন লাইন টিভি র প্রতিষ্ঠাতা ও চীফ এডিটর প্রিয় সাংবাদিক Alamgir Apu বলেন,কারো কারো লুংগী পরে ঘুমানোর পর নিজের অজান্তে সকালে নাকি গলার মাফলার হয়ে যায়।

বেশী মজা পেতাম দাদার বাড়ীর পুকুরে লুংগীর নীচে গেরো দিয়ে তা বেলুনের মতো ফুলিয়ে পানিতে ভাসা ভাসা, আহা কি আনন্দ।

ঢাকা এবং চট্টগ্রাম এর রিকশা ওয়ালারা এখনো লুংগীর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। জব্বারের বলি খেলায় বলিরা লুংগী গোঁজ মেরে কুস্তি ধরতো, হাডুডু, গোল্লাছুট কত খেলা লুংগী পড়ে। লাঠি খেলাও দেখেছি। সেই যে আমার নানা রংগগের দিন গুলো,কোথায় হারিয়ে গেলো।

 

বোতাম নেই,দড়ি নেই,ফিতা নেই,বেল্ট নেই,সেপ্টিপিন নেই, এ এক আশ্চর্য জিনিস কে আবিষ্কার করেন জানিনা যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পরাভূত করে আনাদের কোমরে থাকে কি করে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী লুংগী নৃত্য একথারই প্রমান দেয়।

 

বিশিষ্ট বেতার ব্যক্তিত্ব Fazal Hossain বলেন,'”আমার মনে হয় লুংগী পরেনা এরকম বাংলাদেশী খুব কমই পাওয়া যাবে। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারের অন্যতম প্রধান সংগঠক শব্দসৈনিক মুক্তিযোদ্ধা বেলাল মোহাম্মদ আমরণ লুংগী পরেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। তিনি সাদা লুংগী এবং সাদা ফতুয়া পরতেন নিয়মিত, এমন কি স্বাধীনতার পর বেতারের কর্মকর্তা পদে থেকেও তিনি ওই একই ড্রেসে অফিস করেছেন। কবি আব্দুস সালামকেও দেখেছি একইভাবে। মনে পড়ছে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল প্রাইমারী স্কুলে আমার প্রিয় শিক্ষক কবি মাষ্টার জনাব আলাদীন আলী নুরের কথা, উনি রঙিন লুংগী এবং রঙিন ফুল হাওয়াই শার্ট পরতেন নিয়মিত।'”

কবি ও বিশিষ্ট ব্যাংকার Zafar Alam এর উক্তিটি ভালো লেগেছে,।নতুন প্রজন্মের লুংগী বিমূখতা নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে আমার এফবি ওয়ালে লিখেছেন,

‘”লুংগী নিয়ে লেখাটি ভাল লাগল ।আমরা যারা পুরনো তাঁদের সাথে লুংগীর সখ্যতা কতটুকু তা লেখায় সহজে বুঝানো প্রায় অসম্ভব । দেশ বিদেশে যেখানে যাই সাথে লুংগী যাবেই । বিশেষত লুংগী পরিধান ব্যতিত ঘুমানো কঠিন ।স্নিপিং স্যুট, টাউজার ইত্যাদিতে অদ্যাবধি মানিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি ।একবার লুংগীবিহীন চট্টগ্রাম চলে যাই । অগত্যা রেস্ট হাউজে আমার এক বন্ধু কড়কড়ে একটি লুংগী এনে দেয় ।অবশ্য দু চারবার ধোয়া না হলে লুংগী শরীরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে চায়না । সেবার বেশ বুজেছি লুংগীর কদর ।তখন থেকে নিজ দায়িত্বে লুংগী লাগেজ বা ব্যাগে নিতে ভুল করিনা ।

বাংলাদেশ ছাড়া উপমহাদেশের মায়ানমার, ভারতের কয়েক রাজ্য, নেপাল এবং থাইল্যান্ড , মালেশিয়ায় লুংগীর প্রচলন প্রচুর । মালেশিয়া , মিয়ানমারেতো লুংগী জাতীয় পোশাকের অন্ত:ভূক্ত ।

তবে নব প্রজন্ম মনে হয় লুংগী সংস্কৃতি থেকে দুরে ছিটকে পড়ছে । আমার ছেলেকে যতটুকু মনে পড়ে দু দফায় দুটি লুংগী ক্রয় করে দিয়েছিলাম ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে । কিন্তু না, রপ্ত করাতে পারলামনা । লুংগীর সপক্ষে আন্দোলন মনে হয় মন্দ হবেনা । মজলুম জননেতা ভাসানী থাকলে নিশ্চয় সম্মুখ সারীতে থাকতেন ।দু’ একটা সমস্যা ছাড়া লুংগীর উপকারিতা বেশী । লুংগী পরা অবস্থায় অভিব্যক্তি লিখলাম । ধন্যবাদ প্রিয় ভাই জিয়া হাবীব।'”

বিষয়টি নিয়ে প্রিয় গবেষক ও আইনের শিক্ষক সাঈদ আহসান খালিদ জাতির সামনে কথা বলে নিজেকে স্বমহিমায় আবার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং লুংগী প্রসংগে আলোচনার সুযোগ করে দিলেন। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

তাঁর লিখাটা এখানে কপি পেস্ট করলাম,

এক ডজন আধুনিক লুঙ্গি-সম্প্রসারণ:

 

১. ‘স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গি থাকে যবে একসাথে,

শ্রেষ্ঠ ঘুম হবে সে রাতে’।

২. ‘লুঙ্গির মতো বড়ো পরশ পরিধেয় আর নাই’।

৩. ‘লুঙ্গিকে ঘৃণাকারী বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য’।

৪. ‘ত্রি-কোয়ার্টার থাকলে স্মার্ট হওয়া যায়; কিন্তু লুঙ্গি না থাকলে সুখী হওয়া যায় না।

৫. ‘প্রয়োজনে আচমকা যে গিঁট খুলিতে প্রস্তুত, লুঙ্গি পরার অধিকার তাহারই’।

৬. ‘লুঙ্গি যে না পরে আর লুঙ্গি যে না সহে

তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’

৭. প্যান্ট বলে, ‘লুঙ্গি, তুই বড়ো গ্রাম্য ‘

লুঙ্গি বলে, ‘ভাই, আমি একারণেই কাম্য’

৮. ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় সুখ কে বলে তা বহুদূর,

লুঙ্গির মাঝে স্বর্গ-সুখ, লুঙ্গিতেই রাত মধুর’

৯. ‘নিজের লুঙ্গিতে নাই যার মন

কে বলে মানুষ তারে, কমিক সেই জন’

১০. ‘লুঙ্গি দেখে কেউ করিস নে ভয়

আড়ালে তার আরাম হাসে;

খোস-পাঁচড়ায় হারা হাসি

লুঙ্গিতেই ফিরে আসে’

১১. ‘মিথ্যে শুনিনি ভাই-

লুঙ্গির চেয়ে বড় কোন আরাম আর নাই’।

১২. ‘সংসার সাগরে নানা চুলকানির খেলা

লুঙ্গি আরামের একমাত্র ভেলা’

গরমে লুঙ্গি পরুন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকুন।

 

বাংলাদেশের লুংগী শিল্প বিকশিত হয়েছে বহু আগে। আড়ং লুংগী সেরা আরাম। বাবুর হাট, নারায়ণ গন্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লুংগী ব্যাবসার কেন্দ্র। এদেশের লুংগী মানসম্মত বিধায় তা বিদেশেও রপ্তানি হয়। আমাদের লুংগী শিল্প বিকশিত হোক,জয় হোক লুংগীর।

 

লেখক

এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান,

আইনজীবী , মানবাধিকারকর্মী ও বিশিষ্ট কলামিস্ট।

 12,843 total views,  1 views today

শেয়ার করুন

One response to “লুংগী সমাচার, আমাদের ঐতিহ্য: জিয়া হাবীব আহসান ”

  1. Mohammed Younoos says:

    Fabulous and fentastic
    Thank you Zia
    Old is gold

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© আইন আদালত প্রতিদিন। সর্বসত্ব সংরক্ষিত।
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web