বৃহস্পতিবার, ১৮ অগাস্ট ২০২২, ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন

লিজ নেওয়া জমি দেখিয়ে তিনশ কোটি টাকা ঋণ!

লিজ নেওয়া জমি দেখিয়ে তিনশ কোটি টাকা ঋণ!

Spread the love

২০০৯ সালে প্রবাসে থাকতেই শুরু টাইলস ব্যবসায় হাতেখড়ি। ২০১৪ সালে ফোসান সিরামিক ও হাইটেক সিরামিক লিমিটেড নামে আমদানিতে অধিক মূল্য দেখিয়ে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। ৪টি ব্র্যান্ডের সিরামিকস বা টয়লেট সামগ্রির ব্যবসার আড়ালে প্রতারিত করেছেন শত শত মানুষকে।

এখানেই শেষ নয়, প্রতারণার অর্থ হতে প্রায় ১৩০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। সেটি দেখিয়ে আবার বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নিয়েছেন তিনশত কোটি টাকার ঋণ। দেশে বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৯টি অ্যাকাউন্ট ও বিদেশে ৩টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্টও রয়েছে।

প্রতারণার মাধ্যমে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে শত কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগে জিয়াউদ্দীন ওরফে জামানকে রাজধানীর উত্তরা থেকে আটক করেছে র‌্যাব।

dhakapost

আটকের পর র‌্যাব বলছে, বিভিন্ন থানায় প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে রয়েছে ১৮টির বেশি মামলা। আটক জিয়া উদ্দিন নিজেকে ১২টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা এমডি হিসেবে দাবি করেন। এ ধরনের তথ্য সম্বলিত ভিজিটিং কার্ডও তৈরি করেছেন। এছাড়াও তার অস্ট্রেলিয়া, চায়না, হংকং, ওমান ও দুবাইয়ে নানাবিধ ব্যবসা রয়েছে বলে ভূয়া প্রচারণা চালান। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে কৌশলে প্রলুব্ধ করে ব্যবসায়িক পার্টনার বানানোর নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) বেলা পৌনে ১১টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১ এর অভিযানে রাজধানীর উত্তরা হতে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জিয়াউদ্দিন ওরফে জামান (৫৫) আটক করা হয়।

অভিযানে উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্যাংকের ৩৭টি চেক বই, ৬ বোতল বিদেশি মদ, ৯৯ হাজার টাকার জালনোট, ৬ হাজার জাল ইউএস ডলার, প্রতারণামূলক কার্যকলাপের জন্য ফোসান সিরামিক প্ল্যান্ট এবং জিয়া টাওয়ারের কাঠামোগত ভবিষ্যত পরিকল্পনা, ওমানে অর্থ পাচারের তথ্যাদি, প্রতারণামূলক কার্যকলাপের জন্য ‘জাপানে তৈরি’ স্টিকার, ৫ ধরনের আইডি এবং বিজনেস কার্ড, নগদ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং ২০০ কোটি টাকা নেওয়ার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সংক্রান্ত নথিপত্র।

খন্দকার আল মঈন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক জিয়া ব্যবসায়িক প্রতারণা ও বিভিন্ন বিষয়াদি ও কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রতারণায় হাতেখড়ি, অর্ধশত কোটি টাকা পাচার
২০০৯ সালে প্রবাসে থাকা অবস্থায় টাইলস ব্যবসার খুঁটিনাটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করে। বিদেশি দুটি দেশের মাফিয়াদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা এক দেশ হতে অন্য দেশে স্থানান্তর করেন। এতে অর্থ পাচার চক্রের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয়। ২০১৪ সাল থেকে ফোসান সিরামিক, হাইটেক সিরামিক লি. এর নামে আমদানির ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করে টাইলস আমদানি দেখাতেন। পরবর্তী সময়ে ওই সমস্ত দেশে ৬ শতাংশ কোম্পানি ও ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ নিজে গ্রহণ করতেন। আর এভাবেই ২০১৬ সাল থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে আমরা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি।

আকর্ষণীয় উপহারে ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতেন
প্রতারণার কৌশল হিসেবে জিয়া ব্যবসায়ীদের দামি এবং আকর্ষণীয় উপহার পাঠাতেন। পরবর্তী সময়ে তাদের বিদেশে তার কথিত ভূয়া মালিকানাধীন টাইলস ফ্যাক্টরিতে ভ্রমণের ব্যবস্থা করতেন। ফ্যাক্টরির অফিসের পরিদর্শনযোগ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থ দিতেন। তিনি শিগগিরিই বাংলাদেশে এ ধরনের ফ্যাক্টরি স্থাপন করতে যাচ্ছেন বলে ব্যবসায়ীদের প্রলুব্ধ করতেন।

প্রলুব্ধ করে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের টাকা আত্মসাৎ
মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের সরকারি উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে বলে প্রচার করতেন। বিভিন্ন প্রজেক্টের নামে কয়েকশ একর জমি লিজ নিয়ে নিজস্ব বলে প্রচার করতেন। টাইলসহ বেশকিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ধারণা দিতে সাময়িক দোকান ভাড়া করে প্রদর্শন করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের সেখানে পরিদর্শন করিয়ে বিনিয়োগের নামে অর্থ আত্মসাৎ করতেন।

ব্যবসায়িক অংশিদার থেকে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা
২০১৪ সালে ফোসান সিরামিক লি. স্যানিটারি প্যাড, হাইলেডি স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ নানাবিধ পণ্যের আকর্ষণীয় টিভিসির মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে প্রতারিত করতেন। ব্যবসায়িক অংশীদার বানানোর লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যবসায়িক অংশীদারের প্রস্তাব দিয়ে শতাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মূলত ভূয়া আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ভূয়া কোম্পানি ওয়েবসাইট, বিদেশে ভূয়া সাজানো ফ্যাক্টরি এবং অফিস পরিদর্শন, সাজানো বিপণন কেন্দ্র এবং ভূয়া কৃষি খামার দেখে ব্যবসায়ীরা তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে প্রতারিত হতেন।

লিজ নেওয়া জমি দেখিয়ে নিয়েছেন তিনশ কোটি টাকার ঋণ
জিয়া ৪টি ব্রান্ডের সিরামিকস ব্যবসার আড়ালে বিভিন্নভাবে মানুষদের প্রতারিত করেছেন। প্রতারণার অর্থ থেকে প্রায় ১৩০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। যার বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় তিনশত কোটি টাকা ব্যাংক লোনও বাগিয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, তার বাবা একটি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ চাকরি করতেন। পারিবারিকভাবে খুব অর্থবিত্ত ছিল না। মূলত তিনি ২০০৪ সাল অস্ট্রেলিয়ায় যান ডিপ্লোমা করতে। মূলত সেখানেই তার প্রতারণার হাতেখড়ি।

জাল টাকা ও ডলার সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতারণার কাজে তিনি জাল টাকা ও ডলার ব্যবহার করতেন। তিনি জাল টাকা তৈরি করতো কিনা সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্তকারীরা নিশ্চেই বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে
খন্দকার আল মঈন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশে বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৯টি অ্যাকাউন্ট ও বিদেশে ৩টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এছাড়াও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৬০-৭০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব তিনিই ম্যানেজ করতেন। আমরা তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এর ফুটপ্রিন্ট পেয়েছি। আমরা যে মামলা করবো সেটিতে মানি লন্ডারিং এর বিষয় থাকবে। মানি লন্ডারিং এর মামলা সিআইডি করে। তারা নিশ্চই তদন্ত করবেন। তখন কেউ ব্যাংক লোন পাইয়ে দিতে ও অর্থ পাচারে সহযোগিতা করেছেন কিনা তা উঠে আসবে।

 156 total views,  2 views today

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© আইন আদালত প্রতিদিন। সর্বসত্ব সংরক্ষিত।
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web