ঢাকা, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৯ই সফর ১৪৪২ হিজরি

মহামারী প্রসঙ্গে কুরআনের আলোকে যা বললেন অধ্যক্ষ আল্লামা মাহমুদুল হক

এম কে মনির,

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ১২:৩৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৮, ২০২০

 

সকল প্রসংশা মহান আল্লাহর, যিনি আসমান-জমিনের মালিক, যিনি হায়াত মওতের মালিক। দরুদ সালাম সেই বিশ্বনবীর দরবারে যিনি প্রেরিত হয়েছিলন মানব জাতির মুক্তি সনদ হিসেবে, যার পরে আর কোন নবী-রসুল আসবেন না।

সম্মানিত মুসল্লি ভাইয়েরা!
আপনারা জানেন আমরা আজ এক মহা সংকট পার করছি। সেই মহা সংকটের নাম হলো করোনা ভাইরাস। করোনাভাইরাসে আজ থমকে গেছে সারা পৃথিবী। করোনা থাবায় সব খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা আতংকে সব কিছু স্থগিত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন একটাই আতংক করোনা ভাইরাস। চীনের ছোট্ট শহর থেকে বের হয়ে যেভাবে দ্রুত গতিতে বিশ্বকে ভয় দেখাচ্ছে । এতে সবই আতংকিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও এর বাইরে নয়। সব দেশ নিজের মত করে সতর্কতা অবলম্বন করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ রোগের ছোবল কম হলেও ৩৯ জন আক্রান্ত হয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন।

এই ভাইরাসে বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল কলেজ, মাদরাসা। বাচ্চা থেকে বুড়ো পর্যন্ত সকলেই গৃহবন্দি। আতংক গ্রাস করছে সকলকে। এখন আর কেউ দর্শক নয় প্রায় ১৯৬ টি রাষ্ট্র করোনায় আক্রান্ত। অবশিষ্ট রাষ্ট্র করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকায় বিপর্যস্ত। এই করোনা ডান-বাম-রাম-মন্ত্রী এমপি, আমলা, জজ, ব্যারিষ্টার, ধনী গরীব কাউকে চেনে না। সুতরাং এই ভাইরাস মানুষের জীবনের জন্যে বিরাট হুমকি স্বরূপ। তাই এই ব্যাপারে ব্যাপক সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভাইরাস ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। জেনে রাখতে হবে গণজমায়েত এই রোগ সংক্রমণের প্রধান কারণ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতেই নিজদিগকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না’। আল্লাহ আরও বলেন,অর্থাৎ ‘তোমরা নিজদিগকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড় দয়াবান’। এ আয়াতদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,প্রত্যেককে জীবন নাশের কারণগুলো থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। এছাড়া অনেকগুলো হাদিস আছে যদ্বারা মহামারি বিস্তৃতি লাভের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য বলে প্রমাণিত । যেমন রসুল (স:) এর হাদিস ‘রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের মধ্যে মিশাবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের কাছে না নিয়ে যায়’।

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কোন এলাকায় মহামারীর প্রাদুর্ভাবের কথা শোন তবে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় তোমাদের থাকা অবস্থায় মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না’।

বুখারী শরীফে প্লেগ রোগের পরিচ্ছেদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে হযরত উমর (রা.) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করছিলেন পথের মধ্যে তবুক পৌঁছলে তিনি জানতে পারলেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তখন হযরত উমর প্রবীন আনসার ও মুহাজিরদের থেকে পরামর্শ চাইলে অনেকেই তথায় না ঢুকার পরামর্শ দিলে তিনি সেখানে না ঢুকে ওখান থেকে ফেরৎ আসা আরম্ভ করলে তখন হযরত আবু উবাইদা ইবনে জররাহ ওমরকে বললেন,
আমরা আল্লাহর এক তকদীর থেকে অন্য তকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত তোমার কিছু উটকে যদি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও আর সেখানে আছে দুটি মাঠ তৎমধ্যে একটি হল সবুজ-শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী হয়েছে। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও তাহলে তাও আল্লাহর তকদীর অনুযায়ী হয়েছে।

ওই মহামারীতে হযরত আবু উবাইদা মারা যান। তারপর হযরত মুয়ায ইবনে যবলকে গর্ভনর পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনিও সেই মহামারীতে মারা যান। এই মহামারীর নাম ছিল আমওয়াছ। তারপর তিনি হযরত আমর ইবনুল আসকে গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তখন তিনি কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি চালু করেন। তখন তিনি সিরিয়াবাসীকে বললেন, অ সিরিয়াবাসী মহামারী দাউ দাউ করা আগুনের মত আর সেই আগুনের লাকড়ি হলে তোমরা। সুতরাং তোমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও। যাতে করে তোমরা জ্বলতে না পার। অর্থাৎ আক্রান্ত হতে না পার। এ পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি সিরিয়া থেকে মহামারী দূরীভূত করছিলেন। হযরত ওমর একথা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন।

এই সকল হাদিস দ্বারা বুঝা গেল যে, (১) আক্রান্ত এলাকায় যেন কেউ না ঢুকে, আর কেউ যেন তা থেকে বের না হয়। যা স্বাস্থ্যসম্মত। সুতরাং আক্রান্ত ব্যক্তি যাথে জুমা জামাতে ও অন্যান্য সামাবেশে উপস্থিত না হয়। (২) কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সকিপ সম্প্রদায়ের এক কুষ্ঠ রোগী বায়আত করতে আসতে চাইলে রসুল (স.) বলেছিলেন, আমি তোমাকে বায়আত করালাম। যে আক্রান্ত হওয়ার ভয় করে অথবা অপরকে ক্ষতিতে নিমজ্জিত করার আশংকা পোষণ করে সে যেন, জুমা জামাত, সমাবেশে না আসে। রসুল (স:) বলেছেন, ‘সুতরাং জুমআর পরিবর্তে বাড়ীতে একাকিত্বে নামাজ পড়বে। রাসুল (স:) আরও বললেন, তোমরা কুষ্ঠরোগ থেকে এমনভাবে পলায়ন করো যেমনীভাবে সিংহ থেকে পলায়ন করে থাক।

এ ব্যাপারে শরীয়তের কতেক মূলনীতি হলোঃ
১। নিজের অথবা অন্যের কোন ক্ষতি করা যাবে না।
২। যতটা সম্ভব ক্ষয় ক্ষতি প্রতিহত করতে হবে।
৩। শারীরিক সুস্থতা ইবাদত বিশুদ্ধতার উপর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। অর্থাৎ যেই ইবাদাত করলে অসুস্থতার সম্ভাবনা থাকবে সেই ইবাদাত করা যাবে না। যেমন রোজা রাখা অবস্থায় রোগ বৃদ্ধি পেলে রোজা ভেঙ্গে ফেলা যাবে।

উপরোক্ত আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, প্রয়োজনে অবস্থা যদি ব্যাপক আকার ধারণ করে, মহামারী ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হতে থাকে তাহলে মসজিদে সকল ফরজ ও জুমার নামাজ বন্ধ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ। কেবল আযান দেয়াই যথেষ্ট । মসজিদের দরজাসমূহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। শুধু মাত্র আজান চালু থাকবে আর আজানকে সংক্ষেপ করা হবে। আর ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহর পর বলা হবে সাল্লো ফি বুওতিকুম (তোমরা বাড়িতেই নামাজ আদায় করে নাও)।

স্বয়ং রাসুল (স:) তার মুয়াজ্জিনকে এভাবে আজান দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, শীতের রাত/ বর্ষণ মুখর রাত /বাদলা রাত হলে রাসুল (স:) মুয়াজ্জিনকে একথা ঘোষণা করতে নির্দেশ দিতেন-(তোমরা বাড়ীতে নামায় আদায় কর) তোমরা নিজ অবস্থানস্থলে নামাজ পড়ে নাও।

মাওলানা মাহমুদুল হক
প্রাক্তণ অধ্যক্ষ
সীতাকুণ্ড কামিল এম এ মাদ্রাসা
খতিব,কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ

 257 total views,  3 views today