বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৩৩ অপরাহ্ন

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি

 

সাইফুল ইসলাম, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট , নওগাঁ।

আজ পহেলা নভেম্বর, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ঐতিহাসিক দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৭ সালের এই দিনটি গৌরবময় একটি দিন। এই দিনে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রণীত সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচারবিভাগ পৃথকীকরণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল । তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে মাসদার হোসেন মামলায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত মহামান্য আপীল বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের রায় দেন। উক্ত রায়ের দীর্ঘ ০৮ বছর পরে হলেও রায়ে উল্লিখিত পৃথকীকরণের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হয় ।আজকের এই দিনে ২০০৭ সালে হয় যাত্রা শুরু করে বিচারকদের দ্বারা পরিচালিত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি। বিচার বিভাগ পূর্বেও নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ছিল । শুধুমাত্র ম্যাজিস্ট্রেসী প্রশাসনের অধীনে ছিল । পরবর্তীতে মাসদার হোসেন মামলায় মহামান্য আপীল বিভাগের রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের এই দিনে ম্যাজিস্ট্রেসিকে প্রশাসন থেকে পৃথক করে বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হয় । বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বলতে মূলত ম্যাজিস্ট্রেসিকে পৃথকীকরণ বোঝায় ।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৩ বছর পাড় হলেও সব জেলায় এখনও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয় নি, পর্যাপ্ত সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রয়োজনীয় সকল লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারকের সংখ্যা এক হাজার ৮০১ জন। অধস্তন আদালতে বিচারকদের সংখ্যা এক হাজার ৮০১ জন হলেও আদালতের মূল বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে আছেন প্রায় এক হাজার ৪০০ জন বিচারক। আর অবশিষ্ট বিচারকগণ সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয়, ট্রাইব্যুনাল, আইন কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ডেপুটেশনে (পদায়ন) কর্মরত রয়েছেন। অথচ সারাদেশে মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি। মাননীয় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন যে বাংলাদেশে প্রতি ০১ লাখ মানুষের জন্য ০১ জন বিচারক রয়েছেন যা অপ্রতুল । যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ০১ লাখ মানুষের জন্য ৬৫ জন বিচারক এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে প্রতি ০১ লাখ মানুষের জন্য ৩৫ জন বিচারক রয়েছেন । সেখানে বাংলাদেশে প্রতি ০১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০১ জন বিচারক রয়েছেন ।

বিচারক সংকটের কারনে মামলার জট বেড়েই চলছে এবং ন্যায়বিচারের আহাজারি আমরা প্রত্যক্ষ করছি । বিচার বিভাগের সামনে রয়েছে ৪০ লাখের অধিক পাহাড় সম মামলটা জট । এই পাহাড় সম মামলা জট নিরসনে অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রয়োজন বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা । কেননা বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা না গেলে দেশে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভবপর হয়ে যাবে। এতে করে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক বলেন মামলা জট নিরসনে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অন্তত ৫০০০ বিচারক নিয়োগ দিতে হবে । দিন দিন মামলার সংখ্যা বাড়লেও বাড়ছে না বিচারক সংখ্যা । দেশে নিত্য নতুন আইন তৈরীর সাথে নতুন নতুন ট্রাইব্যুনাল এবং আদালত তৈরী হচ্ছে কিন্তু আইনানুসারে উক্ত ট্রাইব্যনাল বা আদালতের জন্য নতুন কোন বিচারকের পদ সৃজন করা হচ্ছে না । একজন বিচারককে দিয়েই অনেকগুলো আদালতের কাজ করিয়ে নেওয়া হয় । যেমন , ২০১৩ সালে শিশু আইন পাশ করে শিশু আদালত তৈরী করা হয় কিনতু অদ্যবধি কোন শিশু আদালতের পদ সৃজন করা হয়নি বরং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারককে নারী শিশু আইনের পাশাপাশি শিশু আদালতের বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ,১৯৮৫ আইনের অধীনে লক্ষ লক্ষ মামলা দায়ের হলেও আজ পর্যন্ত কোন পারিবারিক আদালতের পদ সৃজন করা হয় নি । সহকারী জজকে তার নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি পারিবারিক আদালতের বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । একজন যুগ্ম জেলা জজকে একই সাথে দেওয়ানী মামলা , দায়রা মামলা , সাকসেশন মামলা , অর্থঋণ মামলা এবং নির্বাচনী মামলা পরিচালনা করতে হয় ।

সর্বোপরি মামলার জট নিরসন এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সংখ্যক বিচারক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সকল লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করার কোন বিকল্প নেই । তবে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের প্রচেষ্টায় এবং সরকারের আন্তরিকতায় সেগুলো দ্রুতই সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা করি।

এতো সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিগত দিনগুলোতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসগণ তাঁদের কাজের দ্বারা জন মানুষের আস্থা এবং ভরসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন । করোনা কালীন সময়ে , দুর্যোগ, মহামারী কিংবা কোন বিপর্যয়ের কারণে এক মুহূর্তের জন্যও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি বন্ধ ছিল না এবং আগামীতেও থাকবে না। সাংবিধানিক কারণে এবং দায়িত্বশীল জায়গা থেকে ম্যাজিস্ট্রেসি একটি সার্বক্ষণিক আদালত যা সপ্তাহ ০৭ দিনই খোলা থাকে । সীমিত সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়েও বিগত ১৩ বছরে শুধুমাত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহ প্রায় ৯০ লক্ষাধিক মামলা নিষ্পত্তি করেছে যা বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় আনুপাতিক হারে অনেকগুণ বেশি। আগামি দিনগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেসি তথা বিচার বিভাগ ন্যায় বিচার নিশ্চিতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

 

লেখক:

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নাওগাঁ

 12,598 total views,  2 views today

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© আইন আদালত প্রতিদিন। সর্বসত্ব সংরক্ষিত।
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web