বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:২৭ পূর্বাহ্ন

এল,কে,সিদ্দিকীর স্মরণে দুটি কথা.

এল,কে,সিদ্দিকীর স্মরণে দুটি কথা.

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

একবার আসতে পারবে আমার বাসায়। বললেন স্বভাবসুলভ উচ্চমার্গীয় ভদ্রতায়। এস আমার বাসায়, বলতে পারতেন অবলীলায়। দেরী না করে চলে গেলাম সেদিনই সন্ধ্যায়। উনার ধানমন্ডির বাসায়। গিয়েই চমকে যায়। বিলাসিতার বালাই নাই। আবার উল্টো দারিদ্র্যতা লুকানোর মধ্যবৃত্তিয় তথাকথিত প্রচেষ্টা নাই। সাদামাটা একদম। ভরে গেল মম মন। আহারে নেতারা যদি হত এমন। বরং উল্টো দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে আমাদের দু’নয়ন। অবশ্য তাহলে তিনি কি করে থাকেন ব্যতিক্রম? রবির সেই কবিতার মতো’ভাল জিনিস যত কম হয় ততই ভাল’। ভাল যে যাদুঘরের প্রদর্শনীয় বস্ত হয়ে যাবে কবি তুমি কি জানতে? তাহলে নিশ্চয়ই অন্যভাবে বলতে। হয়ত নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ,তাইত বলেছ

“রেখেছ বাঙালি করে,মানুষ করনি”।

আজ থাকলে হয়তো বলতে ‘নেতা হয়েছ,মানুষ হওনি’।অবশ্য আমার দেখা নেতাকে দেখলে গর্ব করে কবি তুমিও বলতে ‘মানুষ হওয়াই আসল কথা’। দেখ একেই বলে সত্যিকারের নেতা। অন্য পরিচয় অর্থহীন, বাতুলতা। এমনি অসাধারণ নেতা ছিলেন মরহুম এল,কে, ছিদ্দিকী। সীতাকুণ্ডের কৃতি সন্তান,গোটা দেশের গর্ব।

 

কথা বলতে বলতে আলাপ জমে উঠল এ অসাধারণ মানুষটির সাথে। বিমুগ্ধ হয়ে গেলাম উনার নানা কথাতে। সহজ সরল কথা। অথচ কি অসাধারণ বার্তা!কি ধারালো যুক্তি! নিজেকে জাহিরের নেই সামান্য মনোবৃত্তি। অবশ্য থাকার কথাও নয়। তিনিত আর হঠাৎ করে গজিয়ে উঠা ফাস্ট জেনারেশান লিডারশীপের কেউ নন। যাদের আত্মম্ভরিতায় অতিষ্ঠ হয়ে যায় অসহায় জনগণ। তাইত তিনি ব্যতিক্রম।আমাদের অতি প্রিয় জন। ছিলেন অতিসাধারণ।সীতাকুণ্ডের অতি আপন। সীতাকুণ্ডের জন্য কাঁদবেই উনার মন। আমি দেখেছি উনার সেই বোবা কান্না।কায়েমী স্বার্থবাদিতার জন্য যখন ক্যামিকেল কমপ্লেক্স প্রগতি ইণ্ডাষ্ট্রিজ চালু করা গেলনা। অথচ প্রচেষ্টার কমতি ছিলনা। তখনকার শিল্পমন্ত্রী আর এল,কে,সিদ্দিকী যৌথভাবে চেষ্টা করেছিলেন।প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে থেকে আমিও সে প্রচেষ্টায় সামিল ছিলাম। সবই ভেস্তে গেল।কায়েমী স্বার্থবাদিতার কাছে এতসব প্রচেষ্টা মার খেল। তখনকার অর্থমন্ত্রীর চাওয়াটাই পূর্ণ হলো। ফাঁকে উত্তরা মটরস আর অর্থমন্ত্রীর কাছের লোকের ক্যামিকেল ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠল। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রচেষ্টা মার খেল।যেমনি করে মার খেয়ে এসেছে চিরকাল। এখানে এল,কে,সিদ্দিকীরা মার খেয়েছে,খায়,খাচ্ছে। উচ্ছিষ্ট ভোগীরা চিরকালই ফায়দা লুটেছে,লুটে যাচ্ছে।এল,কে,সিদ্দিকী এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ছিলেন খেটে খাওয়া একজন। তাইত একজন প্রকৌশলী নেতা হয়েও তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েন নি। সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়েও উনার অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি।আজকের নেতাদের মতো আঙ্গুল ফুলে বটগাছ হননি। অথচ উনিত হঠাৎ করে গজিয়ে উঠা নন। ছিলেন প্রকৌশলী নেতা,করতেন ঠিকাদারি। মরহুম জিয়াউর রহমানের আহবানে রাজনীতিতে আসলেন। ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। প্রতিপক্ষ উনারই ফুফাত ভাই মরহুম এম,আর,সিদ্দিকী। আর একজন অতি অমায়িক, জনদরদী,অসাধারণ ভদ্রলোক । এ যাত্রায় ধানের শীষের জোয়ারে এল,কে,সিদ্দিকীর জয় হল। উনার নবযাত্রা শুরু হল। সে যাত্রায় উনার সাফল্যের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ব্যর্থতাও যে নাই তা বলা যাবেনা। বরং এক পর্যায়ে স্বীয় দলে বেশ কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।এক্ষেত্রে সীতাকুণ্ডের আরেক কৃতিসন্তান এম,আর সিদ্দিকীর অবস্থাও একইরুপ হয়েছিল। এ দুজনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হতে পারে। সেক্ষেত্রে উনাদের সাফল্য-ব্যর্থতা থাকতেই পারে। কিন্তু এ দুজনের সময়কার শান্তির সীতাকুণ্ড আমরা কি আর দেখতে পাব? আমরা নির্লোভ , ন্যায়নিষ্ঠ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ নেতা কি সীতাকুণ্ডে আর পাব? মনে হয়না। পরিবেশ পরিস্থিতি সে কথা বলেনা। দলীয় সন্ত্রাসকে লালন করেনা এমন নেতাত দেখিনা। এম,আর সিদ্দিকী,আর এল,কে,সিদ্দিকীর মতো মানুষ, তেমন নেতা দেখছিনা।উনাদের সময়কার শান্তির সীতাকুণ্ড নিয়েছে বিদায়। এখানকার জনগণ এখন অতিষ্ট সন্ত্রাসীদের জ্বালায়। জনগণের একটাই কথা, আমরা দুই সিদ্দিকীর মত নেতা চাই। কথার বাগাড়ম্বর আর উন্নয়নের ফিরিস্তি শুনে আমাদের লাভ নাই। আমরা শান্তিতে ঘুমাতে চাই। এটা না দিতে পারলে দয়া করে সরে যান। সে আপ্তবাক্যের মতো’ভাত চাইনা,কুকুর সামলান’।

 

এম,আর,সিদ্দিকীর মতো এল কে,সিদ্দিকীও দলমতের

উর্ধবে উঠা একজন অসাধারণ নেতা। যে কাজে যাকে মানায় তাকেই সে কাজ করার সুযোগ দিতেন। তাইত অন্য অনেক কাজের মতো সীতাকুণ্ড স্কুলের ৮০ বছর পুর্তি উদযাপন করেন সম্পূর্ণ অন্য দলের ছেলেদের নিয়ে। অসাধারণ সুন্দর অনুষ্ঠান উপহার দেন। সেজন্য সেটি শত বর্ষ পুর্তি অনুষ্ঠানের মতো একটি দলান্ধ আর ব্যক্তি অহমিকার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়নি।

 

এল,কে,সিদ্দিকীর দল নিরপেক্ষ ভূমিকার উদাহরণ দেয়া যাবে ভুরি ভুরি। যা ছিল সবার মুখে মুখে। আর জেনেছি সে সময়কার ইউ,এন,ও জনাব প্রকাশ চন্দ্র দাশ আর ইউ,এন,ও সফিকুল ইসলাম লস্করের(আমার ব্যাচমেট) সাথে আলাপচারিতায়। সীতাকুণ্ডবাসীর ধারণা এল,কে,সিদ্দিকী আর লস্করের আমলটা ছিল সীতাকুণ্ডের স্বর্ণযুগ। দুজনের অসাধারণ সততা আর কর্মস্পৃহায় সীতাকুণ্ডের সর্বত্র বয়ে গিয়েছিল উন্নয়নের স্রোত,শান্তির বারতা। সীতাকুণ্ডবাসী সে যুগ ফিরে পেতে চাই। যদিও সে অবস্থা আসার সম্ভাবনা আদৌ নাই।

এল,কে সিদ্দিকী যেখানেই গেছেন সেখানেই উনার স্বভাবসুলভ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলীদের নেতৃত্বদানকারী জনাব সিদ্দিকীর অবদানের কথা সারা দেশের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে আজও স্মরণ করে। রোটারী আন্দোলনে জনাব সিদ্দিকীর অবদান কিংবদন্তীতুল্য। থেকেছেন অনেকদিন আগ্রাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে। দীর্ঘদিন এ সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। আজকের মা ও শিশু হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ, হাতেখড়ি স্কুলসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান জনাব সিদ্দিকীর হাতে গড়া।

সীতাকুণ্ডের গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুতায়ন জনাব সিদ্দিকীর অন্যতম কর্মকাণ্ডের একটি। তবে এ সবকিছু শান্তির সীতাকুণ্ড গড়ে তোলার কাছে নস্যি যা উনাকে হারায়ে সীতাকুণ্ডবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সীতাকুণ্ডবাসী জনাব সিদ্দিকীর মতো নেতার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। যদিও আজ তা অনেকটা দিবা স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে।

 

উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াকালীন থেকে এল,কে,সিদ্দিকীর সাথে আমার জানাশোনা। যদিও রাজনৈতিক মতাদর্শে মিল ছিলনা। আমাদের পরিবারের সাথেও উনার সম্পর্ক কম ছিলনা। দিনে দিনে এটি বেড়েছে।যোগাযোগ করেছি, যোগাযোগ থেকেছে। ‘সীতাকুণ্ড সমিতি -ঢাকা’এক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে। হেন বিষয় ছিলনা যা আলোচনা হতনা।সম্পর্কের সুবাদে কত অন্যায় আবদার করেছি তার নেই সীমা-পরিসীমা। ব্যবহারও সবসময় মানানসই ছিলনা। অথচ তিনি থাকতেন একদম হাসি-খুশি,অতি স্বাভাবিক। পরিমিত কথা বলতেন। বলতেন কম,বেশী শুনতেন। প্রতি কথায় কর্মে সীতাকুণ্ডের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধ ভেসে উঠত।

 

এল,কে,সিদ্দিকী আমাদের মাঝে আর নেই।স্বাভাবিক নিয়মেই নিয়েছেন চির বিদায়। চলে গেছেন সকল কিছুর উর্ধবসীমায়। হে আল্লাহ তুমি তোমার বান্দাকে ক্ষমা করে দাও তোমার অশেষ ক্ষমায়,অপার দয়ায়।আমিন।

হে রাব্বুল ইজ্জত তোমার বান্দার ইচ্ছাকৃত,অনিচ্ছাকৃত অপরাধ বা ভুল মাফ করে দাও তোমার অসীম করুণায়

আমিন,সুস্মা আমিন।

( ১ আগষ্ট মরহুম এল,কে সিদ্দিকীর মৃত্যুবার্ষিকীতে পূর্বের লেখা পুনরায় পোস্ট করা হল।)

 

লেখক:

জসিম উদ্দিন মাহমুদ,

উপসচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 15,550 total views,  1 views today

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© আইন আদালত প্রতিদিন। সর্বসত্ব সংরক্ষিত।
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web